খাটি মুমিন মুসলমানের জন্য নবী (সাঃ) এর ১০ টি আদেশ

অত্র হাদিসে যে দশটি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে প্রথম পাঁচটি ইয়া হইয়া ইবনে জাকারিয়া
(আঃ)- এর মাধ্যমে এবং শেষের পাঁচটি বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু এর মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে ।এ নির্দেশনা গুলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু এর মুখ দিয়ে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে কথাগুলো মহান আল্লাহর।খাটি মুমিন মুসলমানের জন্য নবীর ১০টি আদেশ।
মুমিন মুসলমানের জন্য নবী (সাঃ) এর ১০ টি আদেশ
হাদীসের পরিভাষায় হাদিসের কুদুসী’ বলা হয়।হাদিসটির ব্যাখ্যার জন্য দশটি বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো।

ভৃমিকা

তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। এর পর তিনি সুন্দর উপমার মাধ্যমে শিরকমুক্ত জীবন যাপনের গুরুত্ব বর্ননা করেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লহর সাথে শরীক করে তার উপমা হলো, এমন ব্যক্তি যে, একটি দাস খরিদ করলো।একজন খাটি মুমিন মুসলমানকে যে ১০ টি নবীর আদেশ অবশ্যই মানতে হবে তা নিচে দেওয়া হলো-

১. শিরক মুক্ত জীবন যাপন করা

শিরক হলো মহান ও পবিত্রতম স্রষ্টার বৈশিষ্ট্যগুলির সাথে সৃষ্টির সাদৃশ্য করা। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক মনে করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদতের যোগ্য মনে করা। আল্লাহর কাছে কোন কিছু প্রাপ্তির আশা করা। আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থীর জন্য মাধ্যম অবলম্বন করা, এগুলোই সবাই শিরক। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

২. খুশু-খুযুর সাতে সালাত আদায় করা

আমাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। তবে এ সালাত খুশু-খুযু তথা পণ্য একাগ্রতা ও বিনয়ের সাথে আদায় করতে হবে। অত্র হাদিসে এর সম্পর্কে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তোমরা সালাত আদায় করলে এদিক সেদিক তাকাবে না। অত্র হাদিসে একাগ্রতা ও বিনয়ের সাথে সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, বান্দা সালাতে এদিক-সেদিক না তাকানো পর্যন্ত আল্লাহর চেহারা নামাজের চেহারার দিকে করে রাখেন।
 মহান আল্লাহ তার বান্দার প্রতি নিবিষ্ট থাকেন। যতক্ষণ না সে সালাতে এদিক-সেদিক তাকায় আর যখন সে এদিক সেদিক তাকায় তখন আল্লাহ তার থেকে বিমুখ হন। সালাত খুশু-খুযু এর সাথে আদায়কারীকে সফলকাম বলা হয়েছে। নবী-রাসূল ও সাহাবীগণ পূর্ণ খুশু-খুযুর সাথে সালাত আদায় করতেন।

৩. সওম পালন করা

মুমিনদের জন্য সিয়াম কে ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন, আমি তোমাদের রোজা পালনের নির্দেশ দিচ্ছি। এর উপমা হল সেই ব্যক্তি যে কস্তুরী ভর্তি একটি থলেসহ একদল মানুষের সঙ্গে আছে। কস্তুরীর সুগন্ধ দলের সকলের নিকট অত্যন্ত ভালো লাগে। এখানে সিয়াম পালনের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনার জন্য পেশ করা হয়েছে। সিয়ামের মাধ্যমে তা পালনকারী ব্যক্তি কেবল, কল্যাণ লাভ করবে না বরং এর কল্যাণ সমাজের সকল মানুষের লাভ করে থাকে।
কেননা সিয়াম পালনের মাধ্যমে মানুষ তাকওয়া অর্জন করতে পারে। একজন প্রকৃত রোজাদার শত কষ্ট হলেও সারাটা দিন ধরে যাবতীয় পানাহার কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকে। কোন অদৃশ্য শক্তি তাকে এ থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করলে সে গোপনে পৃথিবীর সকল চক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে যথার্থ সুযোগ লাভ করলেও পানি ও খাদ্যের দিকে হাত বাড়ায় না। তার একমাত্র কারণ তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ।সুতরাং সিয়ামের উদ্দেশ্য হল তাকওয়ার অনুশীলন।

৪. দান-সাদকা করা

ইসলাম অসহায় মানবতার সেবায় অর্থ ব্যয়ের উৎসাহ দিয়েছে। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যায় এর গুরুত্ব আল কোরআনে ৬৯ বারের ও অধিক স্থানে ইনফাক বা অর্থ ব্যয় সম্পর্কে বলা হয়েছে। রিজিক থেকে হলেও দান করার জন্য মহান আল্লাহ ঘোষণা দিয়ে বলেন, সে সমস্ত লোক যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছে তা থেকে ব্যায় করে।
 আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করাকে আল্লাহ উত্তম ঋণ বলে অভিহিত করেছেন। এবং তা বহুগুণ বাড়িয়ে ফেরত দেবেন বলে ওয়াদা করেছেন। যে আল্লাহকে উত্তম ধার দিবে এরপর তিনি তার জন্য তা বহু গুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার। যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে তাদের উদাহরণ একটি বীজের মত। যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় প্রত্যেকটি শীষে ১০০ করে দানা থাকে। আল্লাহ অতি দানশীল সর্বজ্ঞ।

৫. আল্লাহর যিকির করা

ইসলামে আল্লাহর জিকিরের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। জিকিরের উপমা হলো সেই ব্যক্তির নাই, যার দুশমনেরা তার পিছু ধাওয়া করেছে। অবশেষে সে একটি সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করে শত্রু থেকে নিজের প্রাণ রক্ষা করল। তদ্রূপ কোন বান্দা আল্লাহর জিকির ব্যতীত নিজেকে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না।
 জিকির অর্থ স্মরণ করা, অর্থাৎ আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা হৃদয়ের সর্বদা জাগ্রত রেখে তার ওই সন্তুষ্টি কামনায় একনিষ্ঠ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা। জীবন পরিচালনা করাকে আল্লাহর স্মরণ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং সর্ব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা। তার প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য, যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে বসে ও শুয়ে।
হে মমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো এবং সকালে ও বিকেলে ।সর্বক্ষণে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর। মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহ ও তাকে স্মরণ করেন। আল্লাহ বলেন তোমরা আমাকে স্মরণ করো আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর আমার শোকর আদায় কর, আমার সাথে কুফুরি করো না।

৬. জামা’আতবদ্ধ হওয়া

জমায়েত কায়েমের নির্দেশ দেয়া হয়েছে মুসলমানগণ সংঘবদ্ধ হয়ে ইসলামকে অনুসরণ করবে এবং তা সমাজে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ ইসলাম পালনের জন্য এবং ইসলামী জীবন দর্শন ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের কায়েম করার জন্য সংগঠন কায়েম করতে হবে। মুসলিম মিল্লাতের জন্য ইসলামের সংগঠনভুক্ত থাকা খরচ করা হয়েছে।
আল্লাহর জমিনে বাতিলের খোদাদ্রহী মতাদর্শ উৎখাত করে তথায় কোরআন সুন্নাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে আল কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তিনি তোমাদের জন্য দিন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন। যে বিষয়ে তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আর আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি ।
এবং ইব্রাহিম মুসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হল তোমরা দিন কায়েম করবে এবং এতে বিচ্ছিন্ন হবে না। যারা সঙ্গবদ্ধ ভাবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন।, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসে যারা তার প্রতি সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে যেন তারা শিসা ঢালা প্রাচীর।

৭ও৮. নেতার আদেশ শোনা এবং তা মানা

দায়িত্বশীলের আদেশ শোনা এবং মানা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ তোমরা অনুগত্য কর আল্লাহর ও অনুগত্য করো রাসূলের। এবং তোমাদের মধ্যে থেকে কৃতিত্বের অধিকারীদের ইসলামী নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ অনুগত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, প্রকৃত মুমিন তারাই যারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। 
এবং রাসুলের সাথে কোন সমষ্টিগত কাজে শরিক হলে তার কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণব্যাতিত চলে যায় না।যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে তার জন্য রয়েছে অনুগত্য কারীরা আল্লাহর ভালোবাসা প্রাপ্ত হয়।
  • অনুগত্যের মাধ্যমে জান্নাত লাভ করা যায়।
  • অনুগত্য ক্বারীরা নিয়মিত প্রাপ্ত লোকদের সঙ্গী হবেন।
  • অনুগত্য শুধু সৎকাজে অসৎ কাজে নয়।
  • ব্যক্তি পরিবর্তনে অনুবত্তের পরিবর্তন করা যাবে না।
  • দায়িত্বশীল পছন্দ হোক আর না হোক অনুগত্য করা ফরজ।
  • শুদিনে- দুর্দিনে, খুশি -বেজার, সকল অবস্থায় অনুগত্য ফরজ।

৯. প্রয়োজনে হিজরত করা

ইসলামের প্রয়োজনে নিজের জন্মভূমি পরিত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার নাম হচ্ছে হিজরত। ইসলামের কাজ করতে গিয়ে যদি বাতিলের পক্ষ থেকে বিরোধিতা আসে এবং সে বিরোধিতা মোকাবেলা করার সামর্থ্য যদি না থাকে তাহলে আত্মরক্ষা ও ইসলাম প্রচারের সাথে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার বিধান রয়েছে ইসলামে।
রাসূল (সাঃ) এর ওপরে যখন অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা সহ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন ।যা আল কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, হে আমার রব আমাকে মদিনায় প্রবেশ করা উত্তম ভাবে এবং মক্কা থেকে বের করো উত্তমভাবে। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাকে সাহায্যকারী শক্তি দান করো।
এ নির্দেশের পর রাসূল (সাঃ) সাহাবীদের নিয়ে মক্কা থেকে হিজরত করেছিলেন এবং সেখানে একটা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আল্লাহর জন্য বাদ দিন ইসলামের জন্য হিজরত কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে। এর সম্পর্কে সানানু আবিদাউদ উল্লেখ আছে আমি রাসূল (সাঃ)কে বলতে শুনেছি, হিজরত বন্ধ হবে না ততক্ষন, যতক্ষণ না সূর্য তার অস্ত যাওয়ার দিক থেকে উদিত হয়।

১০. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা

জিহাদ শব্দের অর্থ হলো, কোন উদ্দেশ্যকে তার সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রাণান্তর প্রচেষ্টা চালানো। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা, ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় জিহাদ হলো মহান আল্লাহর বাণী ও দ্বীনকে সমুন্নত ও বিজয়ী করার সর্বাত্মক সংগ্রামে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা করা হয় তাকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ বলে।
 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে, যে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত নেই অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী যে রাষ্ট্রে পরিচালিত হয় না সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ বা সংগ্রাম করা ফরজ। মহান আল্লাহরসর্বাবস্থায় জিহাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, তোমরা বের হও স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামসহ এবং জিহাদ করা আল্লাহর পথে। নিজেদের মাল ও জান দিয়ে। 
তোমাদের জন্য অতি উত্তম যদি তোমরা বুঝতে পারো। আখিরাতের কঠিন আজাব থেকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই জিহাদ করতে হবে। জিহাদের কাজে কিছু সময় ব্যায় করা দুনিয়ার সবকিছু থেকে উত্তম। আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু বলেছেন আল্লাহর পথে একটা সকাল এবং একটা সন্ধ্যা ব্যয় করা দুনিয়ায়ও এর সমস্ত সম্পদ থেকে উত্তম।

শেষ কথা

  1. সর্বপ্রকার শিরক পরিহার করে এক আল্লাহর দাসত্ব করতে হবে।
  2. পূর্ণ একাগ্রতা ও বিনিয়র সাথে সালাত আদায়ের শ্রম পালন দান সদকা করা এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণ এর মাধ্যমে ঈমানকে মজবুত করতে হবে।
  3. একজন মুমিনের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসলামী সংগঠনভুক্ত থাকতে হবে।
  4. দায়িত্বশীলের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার পূর্ণ অনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য।
  5. আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য জান ও মাল দিয়ে প্রাণঅন্তকর চেষ্টা করতে হবে এবং প্রয়োজনে হিজরত করতে হবে।

মহান আল্লাহ সকলকে দিনের পূর্ণ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন আমীন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *